মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) শহর দুবাই। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রের দক্ষ পেশাদার ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে নতুন নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এখনকার কর্তৃপক্ষ। নীতি সংস্কারের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতে অবকাঠামোগত রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় সরকারি ব্যয়ও ক্রমে বাড়ছে। মঙ্গলবার ঘোষিত ২০২৫-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এর আরেক দফা প্রতিফলন দেখা গেল। সেখানে দুবাইয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যয় পরিকল্পনার পাশাপাশি বড় ধরনের উদ্বৃত্তের আভাস দেয়া হয়েছে। খবর দ্য ন্যাশনাল নিউজ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আগামী তিন বছরে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুবাই সরকার খরচ করবে ২৭ হাজার ২০০ আমিরাতি দিরহাম বা ৭ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কৌশল পূরণে ঘোষিত এ বাজেট অঞ্চলটির জন্য এ-যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
শুধু ২০২৫ সালে সরকার ব্যয় করবে ৮ হাজার ৬০০ কোটি দিরহাম। এর প্রায় অর্ধেক বা ৪৬ শতাংশ ব্যয় হবে সড়ক, সেতু, পরিবহন ব্যবস্থা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ অবকাঠামো খাতে। এ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দুবাইয়ে অভিবাসন বৃদ্ধির সাক্ষী হওয়া আল মাকতুম বিমানবন্দরের উন্নয়ন।
সাম্প্রতিক দশকে জ্বালানি তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে বৈচিত্র্যকরণ নীতিতে হাঁটছে ইউএই। সেই সূত্রে নীতি সংস্কারের ফলে বিদেশী বিনিয়োগ ও ধনীদের অভিবাসনে অন্যতম গন্তব্য হয়ে উঠেছে দুবাই, আবুধাবি বা শারজার মতো জাঁকজমকপূর্ণ শহরগুলো। এতে বৈধ অর্থের পাশাপাশি অবৈধ অর্থের অন্যতম বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দুও হয়ে উঠেছে অঞ্চলটি। গত বছর দুবাইয়ে কমপক্ষে এক লাখ নতুন বিদেশী থিতু হয়েছেন। স্থানীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুসারে, এখনকার জনসংখ্যা ৩৮ লাখ থেকে ২০৪০ সাল নাগাদ বেড়ে দাঁড়াবে ৫৮ লাখে। এ কারণে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ সরকারের লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
বাজেট লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কর, রাজস্ব ও অন্য ফি থেকে ৯ হাজার ৭৬৬ কোটি দিরহাম আয় করতে চায় সরকার। এতে রিজার্ভ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকছে ৫০০ কোটি দিরহাম।
মাইক্রো ব্লগিং সাইট এক্সে তিন অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করে দুবাইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ বলেন, ‘আজ আমরা ২০২৫-২৭ অর্থবছরে দুবাই সরকারের জন্য বাজেট অনুমোদন করেছি। ৩০ হাজার ২০০ কোটি দিরহাম আয় ও ২৭ হাজার ২০০ কোটি দিরহাম ব্যয়ের এ পরিকল্পনা এমিরেটসের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট।’
তিনি আরো জানান, এ বাজেট অঞ্চলটির ‘উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে সমর্থন, সামগ্রিক অর্থনীতিকে উদ্দীপিত করতে এবং উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমিরাতের সংকল্পের একটি স্পষ্ট অভিব্যক্তি’। এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে দুবাই প্ল্যান ২০৩০, দুবাই ইকোনমিক এজেন্ডা (ডি৩৩) ও কোয়ালিটি অব লাইফ স্ট্র্যাটেজি ২০৩৩ মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য।
উন্নত প্রযুক্তি, শিক্ষা, সামাজিক জীবন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে দুবাইয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়। বাজেটের ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় হবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন ও কমিউনিটি পরিষেবার মতো সামাজিক ক্ষেত্রে। এছাড়া ন্যায়বিচার নিশ্চিত ও নিরাপত্তার মতো খাতে ব্যয় হবে ১৮ শতাংশ বাজেট। প্রায় ৬ শতাংশ বরাদ্দ করা হবে সরকারি পরিষেবা, গুণমানে উৎকর্ষ, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায়।
শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ বলেন, ‘আগামী বছরের বাজেটে প্রথমবারের মতো মোট রাজস্বের ২১ শতাংশ পরিচালন উদ্বৃত্ত থাকবে। এর লক্ষ্য হলো, দুবাই সরকারের জন্য আর্থিক স্থিতিশীলতা তৈরি করা।’
মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান বাণিজ্য, পর্যটন ও ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলো দিন দিন আরো উন্নত হচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রকাশিত গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স থেকে দেখা যায়, প্রতিভাবান পেশাজীবীদের প্রবেশ সহজ করার জন্য আবুধাবির সঙ্গে দুবাই বিশ্বব্যাপী প্রথম স্থান অধিকার করেছে। এছাড়া ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এফডিআই মার্কেট জরিপ অনুসারে, চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা সত্ত্বেও আমিরাত চলতি বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) গ্রিনফিল্ড ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রকল্পের জন্য বিশ্বের শীর্ষ গন্তব্যের অবস্থান ধরে রেখেছে।
শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ জানান, পূর্ণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দুবাই। এর পেছনে উদ্দীপনা হয়ে আছে উন্নত আর্থিক স্থায়িত্ব।
আরব বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে বিবেচিত সংযুক্ত আরব আমিরাত। কভিড-১৯ মহামারীর মন্দা কাটিয়ে সাম্প্রতিক বছরে দেশটি শক্তিশালী গতি বজায় রেখেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছর শেষে জিডিপি দাঁড়াবে ৪ শতাংশে। এতে বড় ধরনের অবদান রাখবে জ্বালানি তেলবহির্ভূত খাত। চলতি বছরে এ খাতের জন্য ৫ দশমিক ২ এবং ২০২৫ সালের জন্য ৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
এ মাসের শুরুর দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রিসভা ২০২৫ অর্থবছরের জন্য দেশটির সাধারণ বাজেট অনুমোদন করেছে। এতে ইউএইর ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড়’ ব্যয় ৭ হাজার ১৫ হাজার দিরহাম অনুমোদন হয়েছে। বাজেটে আয়ের অংকও সমান ধরা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে সরকার বলছে, কেন্দ্রীয় সাধারণ বাজেট পরিকল্পনায় ‘আয় ও ব্যয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান’ বজায় রাখা হয়েছে।